Thursday, October 8, 2015

তেলাপোকা ---''রুহুল আমীন



নিলাদ্রী তার স্ত্রীকে তরকারিতে বেশি মরিচ দেবার জন্য দু'কথা শোনাচ্ছিল ।দুপুরে আধা কেজি মাংসে ত্রিশটি শুকনা মরিচ দিলে ,কতকরে বললাম -শুকনা মরিচে আমার সমস্যা হয়।টয়লেটে গেলে যন্ত্রণা হয় ,অম্বল বৃদ্ধি পায় ,তুমি শুনলে না।রাতে আবার চিংড়ি মাছ ভোনা করলে -তাতেও শুকনা মরিচ !আর পারি না তোমাকে নিয়ে ।
-নীলাদ্রির স্ত্রীও নাছোড় বান্দা , তরকারিতে মরিচ কম হলে খাওয়া যায় ?মাংসে মরিচ কম দিয়ে আমি খেতে পারব না ।
--নীলাদ্রি ক'বার হেউ -হেউ করে গলার বিশ্রী রকম শব্দ করে অম্বল তুলে বলল যন্ত্রণা বোঝ ?
--না , বুঝি না , শরীরের যন্ত্রণা , নাকি মনের ?স্ত্রী সুমিতার উত্তর ।শরীরের যন্ত্রণা যদি হয় , তবে সে বুঝেছিল শিশু রাজন ,খুলনার শিশু রাকিব ।যখন রাকিবের মলদ্বারে হাওয়া মেশিন দিয়ে মেরে ফেলা হয় তখন যন্ত্রণা বুঝেছিল।আর যদি মনের যন্ত্রণা হয় তবে আমি বুঝেছিলাম আমার বাবা মারা গেলে ।
--নিলাদ্রী সুমিতার কথা শুনে শিশু নির্যাতনের দুটি ঘটনা চোখের সামনে এনে কিছু সময়ের জন্য অম্বলের যন্ত্রণা ভুলে গেল।
এ ঘর থেকে ও ঘর পায়চারি শুরু করল।সমুদ্র বালুচরে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা শিশু আয়লান ও চোখের সামনে আসতে বাদ রইল না ।সুমিতা ততক্ষণে ঘরের জিরো লাইট জ্বেলে বাকি সব লাইট নিভিয়ে দিয়েছে ।ড্রেসিং টেবিলে দাড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে ।চুলে বেনী বাধছে আর খুলছে।অন্ধকারে আয়নায় মুখ দেখা যাচ্ছে না তবুও কেন ড্রেসিং টেবিলের সামনে তা হয়ত সুমিতি নিজেই জানে না ।চুল বাধি শেষ করে ড্রয়ারটা টেনে কি যেন একটা বের করে অন্ধকারে দু'একবার হাত বুলিয়ে আবার রেখে দিল।
--নিলাদ্রী হঠাৎ ইউরেকা বলে টয়লেটের লাইটটা জ্বেলে টয়লেটে প্রবেশ করবে এমন সময় একঝলক আলোর ছটা সুমিতার মুখে পড়তেই দেখলো মুক্ত দানার মত দু ফোঁটা জল চোখের কোন গড়িয়ে দ্রুত নিচে ধাবিত হচ্ছে ।
--টয়লেটে বসে স্ত্রীর মুখখানা মনে করে কারণ খুজতে পিছনে ভাবতে শুরু করে উত্তর পেতে দেরি হলো না নিলাদ্রীর ।মানুষের জীবন কি বিচিত্র -হাসি -কান্না ,সুখ -দুঃখ সব পাশাপাশি বহতা নদীর মত বয়ে চলে।সুখ-দুঃখের মত জীবন -মৃত্যুর খেলা চলে সমান তালে।ঘরে ঘরে নতুন মুখের আগমনে আযান ,উলুধ্বনি আবার পুরাতন মুখের বিদায়ে শোকের মাতম।হঠাৎ নিলাদ্রী দেখল টয়লেটের ফ্লোরে একটি তেলাপোকা ।
পরিছন্ন তকতকে রুমের কোথাও আবর্জনা বা আড়াল নেই ,ফ্লোর প্রতি সপ্তাহে ফিনাইল দিয়ে মোছা হয় ।তারপরও তেলাপোকা কোথা থেকে এল বিড়বিড় করে বলল নিলাদ্রী।
তার চেয়ে চমকে উঠল তেলাপোকার অবস্থা দেখে।পা গুলো উপরে তুলে টাইলসের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে এক বর্গহাত জায়গা নিয়ে শুধু ঘুরছে, প্রাণপন চেষ্টা করছে উঠে দাঁড়াতে কিন্তু পারছে না।কীভাবে তেলাপোকাটি উল্টে গিয়ে পিঠে হাটি শুরু করেছে তা শুধু ঐ ছোট পোকাটিই জানে ।নিলাদ্রী বালতি হতে এক মগ পানি নিয়ে তেলাপোকার গায়ে ছুড়ে মারলো যাতে করে পানির ঝাপটায় সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে , কিন্তু কিছুই হল না ছোট পোকাটির।ছয় জোড়া পা আরো জোরে জৌরে নাড়তে লাগলো।এতে করে পানিতে পিচ্ছল হয়ে যাওয়া টাইলসে ঘোরার মাত্রা বেড়ে গেল।এভাবে কয়েক মিনিট চলার পর থেমে গেল পোকাটি।কিছু সময় বিরতি নেবার পর পুনরায় আবার কাজ শুরু করল।এভাবে চলতে থাকল বেশ কিছু সময় ।ছোট তেলাপোকার জীবন যুদ্ধ দেখতে বেশ ভালই লাগছিল।মাঝে মাঝে এক মগ করে পানি দিতে থাকলো নিলাদ্রী।
পানি দিলে যুদ্ধ বেড়ে যায় আবার কিছু সময় পর থেমে যায়।সবকিছু ভুলে এই দৃশ্য দেখতে চৌকি টেনে বসে রইল নিলাদ্রী।দুটি পা শরীর হতে আলাদা হয়ে গেল ।কোথা হতে একদল পিঁপড়া এসে তা টেনে নিতে শুরু করল।তখনও তেলাপোকার অন্য। পা গুলো একটু একটু করে নড়ছে।আরো কিছু সময় পর নিস্তেজ তেলাপোকার দেহখন্ডটির মুখের সুড় ধরে টয়লেটের কমোডে ফেলে পূণরায় এক মগ পানি দিয়ে বের হয়ে এল নিলাদ্রী।
বেড রুমের লাইটের সুইচ অন করে বডি স্প্রে বের করে দু'বার স্প্রে করে বিছানায় গা এলিয়ে সুমিতার মাথায় হাত রাখল ।সুমিতা তখন মৃত বাবার স্মৃতি মন্থন করতে করতে চোখ বুজে ঘুমনোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে।
নিলাদ্রী স্ত্রীর মাথায় হাত রেখে চোখ বুজতেই একদল তেলাপোকার যত্রতত্র বিচরনের ছবি ভেসে উঠল চোখে ।জীবন-মৃত্যু ,জীবনের বিচিত্রতা নিলাদ্রীর বোঝা হলো না ।কানে এল তেলাপোকার কান্না ।

     9/10/2015
শালিখা ,মাগুরা
বাংলাদেশ ।
kmrahat81@gmail.com

No comments:

Post a Comment