বাদলের মনটা আজ ভাল নেই।একাকী চিত্রার ধারে বসে আছে বাদল ।মনটা আজ কেন যেন ঘরে ফিরতে চাইছে না ।প্রকৃতির লীলা খেলার মাঝে মিশে থাকতে চাইছে।শ্রাবনের আকাশ ,সারা আকাশে মেঘেরা লুকোচুরি খেলছে।
আকাশের দিকে তাকালে মনে হচ্ছে ক্রোধের কালিমায় ঢেকে গেছে আকাশের মুখ।ফেটে চৌচির হয়ে গেছে আকাশের বুক।আকাশের চোখের কোনায় কোনায় অশ্রু টলমল করছে ।এখনই ঝরে পড়বে অশ্রু।আকাশের কান্না দেখতে বাদলের মনটা আনচান করছিল।ছোট ছোট ঢেউ এসে কুলে আছড়ে পড়ছে।নদীর ওপর থেকে কাশবনের ফুলগুলো মাথা বাঁকিয়ে বাকিয়ে ওপারে যাবার জন্য স্বাগত জানাচ্ছে ।কিন্তু এপারের সবুজ সতেজ ঘাসগুলি যেন বাদলের জন্য বিছানা চাঁদর পেতে রেখেছে।তারপরও শ্রাবনের আকাশ যেন কেঁদে কেঁদে বলছে বাদল তুমি ঘরে ফিরে যাও ।হঠাৎ বাদল কাধের উপর একটি স্পর্শ অনুভব করল।
দু ঠোঁট থেকে অস্পষ্টভাবে বেরিয়ে এল কে ?
পরিচিত একটি কন্ঠস্বর বলল -আমি নীলা ,তুমি কেমন আছ বাদল ?
পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকা বাদলের কাছে ,কেমন আছি এ কথার সঠিক উত্তর জানা নেই।
উত্তর না পেয়ে নীলা বাদলের চোখের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ।বাদলের চোখের পলক প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে গেছে ; হারিয়ে গেছে শুকনো মাটিতে আটকে থাকা শামুক ঝিনুকের মরা লাশের মাঝে ।চোখের কোনায় জল জমতে শুরু করেছে।শ্রাবনের আকাশ থেকে কয়েক ঝাপটা জল এসে চোখের জলের সাথে মিতালি করে গেল ।ততক্ষণে নীলার কালো কেশে বিন্দু বিন্দু জল জমে শরতের সকালের ঘাসের উপর শিশির ভেজা নীলাম্বরী মনে হচ্ছে ।নীলার অবচেতন মন থেকে জিহ্বার আড়ষ্টতায় বের হল বাদল আমি কি অপায়া অচ্ছুত নারী ?
--নীলা তুমি চুপ কর , আমাকে একটু একা থাকতে দাও ।
--বাদল , আমি জানি তুমি খুব কষ্ট পাচ্ছ ,কিন্তু কি করব বল ,দেখ আকাশটা কত বড় ,কত উদার , কত মহৎ , কিন্তু তার বুকেও কষ্ট আছে ,কান্না আছে।পাহাড়টা পাথরে গড়া বোবা হলেও ঝর্নায় তার কান্না ।কি দোষ ছিল আমার , কেন এই অপবাদ আমি বয়ে বেড়াব ,আমি কি অন্যায় করেছিলাম ?
কথাগুলো বলতে বলতে নীলার স্বর পাল্টে যায় ।
চোখ দিয়ে বিন্দু বিন্দু জল গড়িয়ে নিচের দিকে নামতে থাকে।বাদল আর নীলার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না ,দ্রুত ছুটে পালালো।নীলা অথর্বের মত দাঁড়িয়ে শ্রাবনের বর্ষায় ভিজছে।বাদল বাড়ীতে ফিরে বিছানায় শুয়ে টেপ রেকর্ডে জগজিৎ সিং এর গান শুনতে লাগল আর পুরনো দিনের স্মৃতি চারণ করতে লাগল,-আজ থেকে তিন বছর আগে একদিন বিকাল বেলা নদীর ধারে বসে বাদল কবিতা লিখছে ,হঠাৎ নীলা এসে বলল - বাদল ভাই , এখানে একা বসে কি করছেন ?
--মাছরাঙা আর গাঙচিল মাছ ধরছে আর আমি হিসাব করে খাতায় লিখছি।
--কোথায় দেখি , কতটা হল
একথা বলেই কবিতার খাতাটি টান দিয়ে হাত থেকে নিয়ে নিয়েছিল ।যখন মাত্র কয়েক লাইন কবিতা লিখেছি।নীলা কবিতার লাইন কটি পড়ে বলেছিল , বাহ ! খুব চমৎকার লেখেন তো।
--আমার লেখা চমৎকার নয় তোমার আবৃত্তিটা চমৎকার ,তাই এত ভাল লাগল।
তারপর নীলা আমাকে বলেছিল আমাকে একটি কবিতা লিখে দেবেন ?
সেই যে কবিতা দিয়ে শুরু করেছিলাম তারপর থেকে নানাভাবে দেখা করা , বিকাল বেলা নদীর ধারে সময় কাটানো ।এভাবেই দু'জনার চোঁখে নতুন ঘর বাধাঁর স্বপ্ন ।কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেসে খান খান হয়ে গেল।কারণ নীলার পিতা রায়হান সাহেব মেয়েকে তার কঠিন সিদ্ধান্তের ফাঁদে আটকে বন্ধুর ছেলের সাথে বিয়ে দিলেন।কিন্তু দুঃখের বিষয় বাসর ঘরে নীলার স্বামী আততয়ীদের হাতে নিহত হয়।
জানা যায় একদল সন্ত্রাসীর চাঁদার দাবিতে নীলার স্বামী রিফাত অস্বীকৃতি জানালে ক্ষুদ্ধ সন্ত্রাসীরা রিফাতের জীবনের আনন্দকে বিলিন করতে তাকে হত্যা করে ।কিন্তু রিফাতের হত্যার সাথে সাথে আরেকটি নারী হৃদয়কে হত্যা করে ।নীলাকে ছুড়ে ফেলে সমাজের নিন্দুকদের নিন্দার মুখে ।দাঁতবের করে হাসে রাক্ষসগুলো ।যাদের নখের আঁচড় নীলার উর্বর ভূমিতে ।আজ নীলা অপায়া , স্বামী খাদক এক অচ্ছুত নারী।টেপ রেকর্ডের ফিতা শেষ হয়ে শো শো শব্দে হচ্ছে ।জানালায় কে যেন এসে দাঁড়িয়েছে ।বাদল চোখের জল ।জানালায় চোখ তুলে দেখে বাঁশবনের অন্ধকারে হুতোম পেঁচা ডাকছে।এখনও সকাল হয়নি ।
14/10/2015
শালিখা ,মাগুরা ,বাংলাদেশ ।
kmrahat81@gmail.com
লেখাটি সাহিত্য অঙ্গন ব্লগে প্রকাশিত
sahityangon.blogspot.com
No comments:
Post a Comment