Saturday, October 3, 2015

এভাবে চলছে -চলবে জীবন --- রুহুল আমীন


গ্রামের নাম লক্ষীপুর ।এই গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটি ছোট নদী।নদীটির পূর্ব পাড়ে শিমুল গাছ।বর্ষাকালে নদীতে জল দু'কুল ছাপিয়ে যায় ।শিমুল গাছে মাছরাঙা বসে মাছ ধরে।তবে নদীর জল শিমুল গাছকে ছুতে পারে না ।শিমুল গাছের তলে ছোট একটি কুড়ে ঘরে বাস করে আমিনুদ্দিন।দুই ছেলে এবং এক মেয়ে নিয়ে আমিনুদ্দিনের কষ্টের সংসার।সে নদীতে মাছ ধরে তা দিয়ে কোন রকম চলে ।নুন আনতে পান্তা ফুরালেও আমিনুদ্দিন মাছ ধরে আর গান গায়।আমিনুদ্দিনের বড় ছেলে নবম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে বাপের সাথে নদীতে মাছ ধরে ।মেয়ে আমিনা সপ্তম শ্রেণীতে এবং ছোট ছেলে রাজু চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে।স্ত্রী পুত্র নিয়ে পাঁচ জনের সংসারে উপার্জনের জন্য চারটি হাত আর নদী।নদীর গতি আছে তো পাঁচটি প্রাণী বেঁচে আছে।আমিনা বড় হয়েছে ,এই ভেবে আমিনুদ্দিনের চিন্তার শেষ নেই।আমিনার লকলকে দেহখানা আমিনুদ্দিনকে ভাবতে শেখায় ।এইতো সময় এরপর বয়স হলৈ চাহিদা কমে যাবে ।এটাতো কম বয়স নয় ।কচি লাউয়ের বাজারে চাহিদা থাকে কিন্তু বয়সী লাউয়ে শরীরে নখের আঁচড় দিয়ে ফিরে যায়।কিন্তু সত্যিই কি আমিনার বিয়ের বয়স হয়েছে ?হয়তবা তের বছরে পা দিয়েছে।একটু বেশী হলেও চৌদ্দ বছর ।তবে সামাজিক প্রথা অনুযায়ী আমিনা অনেক বড় হয়েছে ।কারণ বাল্য বিবাহ প্রথা এখনও গ্রাম বাংলার ঘর থেকে উচ্ছেদ হয়নি।এখনও গ্রামের মোল্লা -মৌলভীরা এ ব্যাপারে সচেতন নয়।যদি গ্রামের এসব কাজীরা বিয়ে পড়ানোর আগে জন্ম নিবন্ধটি দেখে সঠিক বয়সে বিয়ে পড়াত তবে এই প্রথার উচ্ছেদ হত।আমিনুদ্দিন মেয়ে বিয়ে দেওয়ার জন্য পাত্র দেখতে শুরু করল।এদিকে নদীতে এখন আর তেমন মাছ ধরা পড়ছে না।সংসারে ক্রমেই অনটন বৃদ্ধি পাচ্ছে কিন্তু কন্যা দায় যে জগতে পিতার কাছে বড় দায়-এটা প্রতিটি পিতাই জানে।হঠাৎ করেই একটি সম্বন্ধে রাজি হয়ে গেল আমিনুদ্দিন।ছেলের বাড়ী পাশের গ্রামেই।ছেলে নৌকায় করে কাঁচামাল চালান করে নোয়াখালী ।ছেলেকে দশ হাজার টাকা পন দিতে হবে এই শ্বর্তে আমিনুদ্দিন রাজি হয়ে গেল ।গ্রামের মহাজন এজিদ মিয়ার কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা সুদে করে নিয়ে মেয়েকে বিয়ে দিল কিন্তু আর পাঁচ হাজার টাকা বাকি রইল।আমিনার বিয়ে দেবার পর সুদের টাকা টানতে গিয়ে সংসারে দেখা দিল মানান্তর।অপরদিকে আমিনার সংসারে সুখ নাই।বাকি পাঁচ হাজার টাকার জন্য শুরু হল আমিনার উপর নির্যাতন ।একদিন নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে আমিনা স্বামীর ঘর ছেড়ে বাপের বাড়িতে এসে উঠল।তারপর থেকে আমিনার স্বামী আমিনার আর খোজ নেয়নি।আমিনুদ্দিন এখন সম্পূর্ণ বৃদ্ধ।সে আর নদীতে মাছ ধরতে যেতে পারে না।বড় ছেলে আব্বাসেথ সামান্য আয়ে কোন রকম খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে ।দিনে দিনে মহাজনের সুদের টাকা বেড়েই চলেছে।মহাজনের চাপাচাপি শ্বর্তেও কোন উপায় নেই ।হঠাৎ একদিন গ্রামের মহাজন সুদের টাকার জন্য আমিনাকে ধরে নিয়ে গেল।পশ্চিমাকাশে সূর্য তখন ঢলে পড়েছে -তার উপর ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত।পরদিন ভোর বেলায় দেখা গেল আমিনুদ্দিনের সেই ছোট কুড়ে ঘর একাকি দাঁড়িয়ে আছে।কুড়ে ঘরটিতে আজ ঘুন ধরেছে।উঠনে আগাছা ভরে গেছে।অফেক্ষামান কুড়ে ঘর আজও আমিনুদ্দিনের জন্য অপেক্ষা করছে।হয়তবা আমিনুদ্দিন এখনও কুড়েঘরটির জন্য চোখের জল ঝরায়।শিমুল গাছটির তলে আমিনুদ্দিনের বসতে ইচ্ছা করে ।

No comments:

Post a Comment