ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল ভিত্তির তৃতীয়টি হল রোযা বা রোজা (ফার্সি روزہ রুজ়ে), সাউম (আরবি صوم স্বাউম্), বা সিয়াম । যার শাব্দিক অর্থ হল বিরত থাকা।
সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার,পাপাচার, কামাচার এবং সেই সাথে যাবতীয় ভোগ-বিলাস থেকেও বিরত থাকার নাম রোযা।
ইসলামী বিধান অনুসারে, প্রতিটি প্রাপ্ত বয়স্ক মুসলমানের জন্য রমযান মাসের প্রতি দিন রোজা রাখা ফরজ, (فرض ফ়ার্দ্ব্) যার অর্থ অবশ্য পালনীয়।
রোজা পাঁচ প্রকার।
১: ফরজ রোজা: যা আবার চার প্রকার-
রমজান মাসের রোজা, রমজানের রোজা ভঙ্গ হলে তার কাযা আদায়ে রোজা, কারণ ব্যতিত রমজানের রোজা ছেড়ে দিলে কাফ্ফারা হিসেবে ৬০টি রোজা রাখা অার রোজার মান্নত করলে আদায় করা।
২: ওয়াজিব রোজা: নফল রোজা রেখে ভঙ্গ করলে পরে তা আদায় করা ওয়াজিব।
৩:সুন্নত রোজা: মহরম মাসের নয় এবং দশ তারিখে রোজা রাখা সুন্নত রোজা।
৪:মোস্তাহাব রোজা: প্রতি চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪, এবং ১৫ তারিখে, প্রতি সাপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবারে, শাওয়াল মাসে পৃথক পৃথক প্রতি সপ্তাহে দুটো করে ছয়টি রোজা রাখা মোস্তাহাব।
৫:নফল রোজা: মোস্তাহাব আর নফল খুব কাছাকাছি ইবাদত। যা ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত নয় এমন ইবাদত পূণ্যের নিয়তে করা নফল রোজা।
ইতিহাস: রোযার ইতিহাসটা প্রথমে হযরত আদম যখন নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার পর তাওবাহ করেছিলেন তখন ৩০ দিন পর্যন্ত তার তাওবাহ কবুল হয়নি। ৩০ দিন রোযা পর তার তাওবাহ কবুল হয়। তারপর তার সন্তানদের উপরে ৩০টি রোযা ফরয করে দেয়া হয়।
নূহ (আ.)-এর যুগেও রোজা ছিল। হযরত নূহ (আ.) ১ লা শাওয়াল ও ১০ জিলহজ ছাড়া সারা বছর রোযা রাখতেন।
হযরত ইবরাহীম(অা:) যুগে ৩০টি রোযা ছিল। হযরত দাউদ (আ.) এর যুগেও রোযার প্রচলন ছিল। তিনি একদিন রোযা রাখতেন এবং একদিন বিনা রোযায় থাকতেন।
আরব বাসীরাও ইসলামের পূর্বে রোযা ছিল। মক্কার কুরাইশগণ অন্ধকার যুগে আশুরার (অর্থাৎ ১০ মুহররম) দিনে এ জন্য রোযা রাখতেন, ইহুদীরা নিজেদের গণনানুসারে সপ্তম মাসের ১০ম দিনে রোযা রাখতেন।
খ্রিস্টানুসারীগণ রোজা রাখলে তাকে বলা হয় ‘ফাস্টিং’। বাইবেলেও রোযা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ইহুদীদের মাঝেও রোযা ছিল । আল্লাহ'র আদেশে মোশি তুর পাহাড়ে চল্লিশ দিন পর্যন্ত ক্ষুৎ-পিপাসার ভিতর দিয়ে অতিবাহিত করেছেন। (যাত্রাপুস্তক:৩৪:২৮)১০,মোশির অনুসারীদের মাঝেও চল্লিশ রোযা রাখাকে উত্তম বলে বিবেচনা করা হতো।
বৌদ্ধগণ রোজা রাখলে তাকে বলা হয় ‘উপোসত’। বিপ্লবীরা পানাহার থেকে বিরত থাকলে, তাকে বলা হয় ‘অনশন’।
মেডিক্যাল সাইন্সে থেকে জানা যায় রোযা হচ্ছে Autophagy 'অটোফেজি’। ২০১৬ সালে নোবেল কমিটি জাপানের ডাক্তার ‘ওশিনরি ওসুমি’-কে অটোফেজি আবিষ্কারের জন্যে পুরষ্কৃত করার পর থেকে এটি অালোচনায় অাসে এবং মানুষ অাগ্রহভরে জানতে শুরু করে। এরপর থেকেই আধুনিক মানুষেরা ব্যাপকভাবে রোযা রাখতে শুরু করে।
Autophagy কি? Autophagy শব্দটি একটি গ্রিক শব্দ। Auto অর্থ নিজে নিজে, এবং Phagy অর্থ খাওয়া। সুতরাং, অটো ফেজি মানে নিজে নিজকে খাওয়া।
মেডিক্যাল সাইন্স সুত্রে হতে বলা যায় শরীরের কোষ গুলো বাহির থেকে কোনো খাবার না পেয়ে নিজেই যখন নিজের অসুস্থ কোষগুলো খেতে শুরু করে, তখন তাকে অটোফেজি বলা হয়। সহজে বলা যায় ঘরে যেমন ডাস্টবিন থাকে, কম্পিউ টারে যেমন রিসাইকেল বিন থাকে, তেমনি আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের মাঝেও একটি করে ডাস্টবিন আছে। সারা বছর শরীরের কোষগুলো খুব ব্যস্ত থাকার কারণে, ডাস্টবিন পরিষ্কার করার সময় পায় না। ফলে কোষগুলোতে অনেক আবর্জনা ও ময়লা জমে যায়।
শরীরের কোষগুলো যদি নিয়মিত তাদের ডাস্টবিন পরিষ্কার করতে না পারে, তাহলে কোষগুলো একসময় নিষ্ক্রিয় হয়ে শরীরে বিভিন্ন প্রকারের রোগের উৎপন্ন করে। ক্যান্সার বা ডায়াবেটিসের মত অনেক বড় বড় রোগের শুরু হয় এখান থেকেই।
মানুষ যখন খালি পেটে থাকে, তখন শরীরের কোষগুলো অনেকটা বেকার হয়ে পড়ে। কিন্তু তারা তো আর আমাদের মত অলস হয়ে বসে থাকে না, তাই প্রতিটি কোষ তার ভিতরের আবর্জনা ও ময়লাগুলো পরিষ্কার করতে শুরু করে। কোষগুলোর আমাদের মত আবর্জনা ফেলার জায়গা নেই বলে তারা নিজের আবর্জনা নিজেই খেয়ে ফেলে। মেডিক্যাল সাইন্সে এই পদ্ধতিকে বলা হয় অটোফেজি।
প্রফেসর ওশিনরি নিজেও সপ্তাহে দুটি করে রোযা রাখেন অথচ অনেকেই নিজ স্বাস্থ্যের কথা ভেবে রোযা রাখি না!প্রতি বছর সহজেই একমাস রোজা রেখে শরীরের অটোফেজি করার এক অপূর্ব সুযোগ।
অাসুন সবাই রোজা রাখি সুস্থ থাকি।
সকলের মঙ্গল হোক এ কামনায় সকলকে মাহে রমযানের শুভেচ্ছা।
(ছড়াকার, কবি, কলামিষ্ট, উন্নয়ন কর্মী)

No comments:
Post a Comment