Friday, November 18, 2016

সমর্পণ -----রুহুল আমীন।


সমর্পণ
রুহুল আমীন।
----------------------
   
আজকের বিকেলটা রিমার কাছে অন্য দিনের তুলনায় ভিন্ন।ভিন্ন আনন্দের, ভিন্ন অনুভূতির।বাবা রজব আলী নিজেই কোচিং ক্লাস হতে মেয়েকে নিতে এসেছে।রিমার চোখে তাই আনন্দ আর ধরে না।বাবার দুই চাকার বাইসাইকেলে উঠে সে যেন প্লেনে চড়ে আকাশ ভ্রমন করছে।আনন্দের মাঝে হারিয়ে গেল শৈশবের স্মৃতিমাখা দিনগুলোতে।বাবার আঙুল ধরে রাস্তা পার হওয়া , স্কুলের ক্লাস অবধি পৌছে দিয়ে কপালে চুমু দেয়া ,পেন্সিল বক্স খুলে দোয়েল পাখিওয়ালা দুই টাকার নোট ভরে দেয়া-আরো কত কী ।আচ্ছা সেই দিনগুলো আবার কেন ফিরে আসে না ?এসব ভাবতে ভাবতে কখন  বাড়িতে এসে পৌছেছে, তা টের পাইনি রিমা।রজব আলী বলে উঠল,
-কিরে মা, নামবি না ?
-এইতো ,নামছি
 রিমা বই খাতা রেখে পোশাক পাল্টে বাইরে আসতেই বাবা রজব আলী পাশের গাঁয়ের হাটে যাবেন বলে মেয়ের কাছে বাজারের ব্যাগ চাইলেন।রিমা ব্যাগ দিতেই  সাইকেলে চেপে হাটের পথে রওনা দিল রজব আলী।
রজব আলী তার একমাত্র মেয়ে রিমা জন্মের পর হতেই আর্থিক অনটনে পড়ে।অল্প শিক্ষিত এই মানুষটি দিনমজুরী করে স্ত্রী ও মাকে নিয়ে কোন প্রকার জীবন অতিবাহিত করছিল।কিন্তু সংসারে একজন নতুন মুখ আসায় নানা প্রকার খরচ বৃদ্ধি পেতে থাকে।এইভাবে কয়েক বছর কেটে গেল।এর মধ্যে মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করা হলো।মেয়েকে নিয়ে রজব আলীর স্বপ্নের শেষ নেই।তাই তার ভবিষ্যতের কথা ভেবে রজব আলী টাকার শহর ঢাকায় এলো।এখন সে গার্মেনটসে কাজ করে।মাঝে মাঝে যখন বাড়ি আসে তখন মেয়েকে নিয়ে আদর ,ভালবাসা, হাসি, আড্ডায় মাতিয়ে আবার ফিরে যায় জীবিকার সন্ধানে।ফিরে যাবার সময় বাবা মেয়ের অশ্রুসজল বিদায় মুহূর্ত দেখতে পাড়ার লোক জড় হয়।জীবন জীবিকার এই চিত্র গ্রাম ,মহল্লায় প্রায়ই চোখে পড়ে।

সন্ধ্যা নামল যখন সূর্যমামা পশ্চিমাকাশে মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ল।বাঁশবনে ঝিঝিপোঁকা একটানা সুর ধরল, আর মসজিদ হতে আজান ও দূরে মন্দিরে কাসার ঘন্টা বেজে উঠল।তখন সাবিনা বেগম মেয়েকে বলল,
-রিমা, ঘরে আলো দেখা ,আর পড়তে বস
-আচ্ছা ,মা
-তোর বাবাকে একটা ফোন করতো, মা ।
-কেন , কি বলল
- ভাত রান্না করে বসে থাকলাম, বাজার কখন আনবে ?
- ঠিক আছে মা , আমি ফোন করছি।
এর মধ্যে সাইকেলের বেল বেজে উঠল- উঠানের এক কোণে।রিমা দৌড়ে বাবার কাছে যেতে যেতে-
-এইতো মা , আর ফোন করতে হবে না, বাবা এসে গেছে।
এরপর রিমার পড়াশোনা আর হলো না।কতদিন পর বাবাকে পেয়েছে, আজ কি আর পড়াশোনাতে মন বসে।শুরু হলো বাবা মেয়ের কতদিনের জমে থাকা কথা।ইতিমধ্যে তাদের কথার মাঝে এসে যোগ দিয়েছে রজব আলীর বৃদ্ধ মা রাশিদা বেগম।রান্না ঘর থেকে মাঝে মাঝে কথা টেনে কথা বলছে সাবিনা বেগম।রাতের খাওয়া শেষ করে সকলে ঘুমতে গেল।বাড়িতে দুটি ঘর।একটিতে মা-মেয়ে থাকে আর অপরটিতে বৃদ্ধ রাশিদা বেগম থাকে।রজব আলী বাড়ি আসলে রিমা দাদির সাথে এক ঘরে থাকে।
রাতে দাদির সাথে শুয়ে দু'একটি কথা বলতে বলতেই দাদি বুকে ব্যথা অনুভব করলো।রাশিদা বেগম রিমাকে বলল,
-বোন , আমার বুকে একটু তেল মালিশ করে দিবি ? তোর মা মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছে ।
- দিচ্ছি , দেখ এখনই ঠিক হয়ে যাবে।
 টেবিলের উপরে রাখা তেলের বোতল নিয়ে দাদির বুকে তেল মালিশ করতে গিয়ে ভীষণ লজ্জা লাগছিল।এর আগে কয়েকদিন দাদির এমন তেল মালিশ করতে হয়েছে ।কিন্তু মা করেছে , এবারই প্রথম তাকে এ কাজ করতে হবে।তাছাড়া রিমা সবে মাত্র কিশোরী।অষ্টম শ্রেণী পড়ুয়া ছাত্রী।লজ্জায় জড়সড় হয়ে দাদির বুকের উপর থেকে কাপড় সরিয়ে চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।
একি ! দাদির একটি স্তন কেন।আর একটির জায়গা ক্ষত বিক্ষত কাটা দাগ।বয়সী চামড়ার ভাজে ভাজে অমসৃণতা ।রিমা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, তার শরীরে কোন সাড়া নেই।দাদি বিষয়টি বুঝতে পেরে বলল ,
-কিরে দিদি ভাই , কি ভাবছিস , তেল মালিশ কর।আমার কষ্ট হচ্ছে ।
- হ্যাঁ ,করছি।কিন্তু দাদি তোমার এমন কি করে হয়েছিল ?
-আগে তেল মালিশ কর , পরে বলব
রিমা তেল মালিশ করে দাদির পাশে শুয়ে দাদিকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-দাদি এবার বল , না হলে আমার ঘুম হবে না।
রাশিদা বেগম কিছু সময় চুপ করে রইল।তারপর ঘটনার বর্ণনা শুরু করলেন।
এটা একাত্তরের বর্বরতা।তুই তো জানিস তোর দাদা মুক্তিযোদ্ধা ছিল।তোর দাদা তখন যুদ্ধে চলে গেছে।আমার তখন সবেমাত্র বিয়ে হয়েছে।গর্ভে তোর বাবা।আমি চার মাসের গর্ভবতী।রাতে তিনজন রাজাকার এসে আমাকে তোর দাদা কোথায় জানতে চাইল।আমি আগেই ভেবে নিয়েছিলাম , মরে গেলেও তোর দাদার ঠিকানা আমি দেব না।ঠিকানা না দেওয়াতে ওরা আমাকে ধরে নিয়ে গেল।পাকবাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে আমাকে ওরা তিনজন মিলে ধর্ষণ করল।আমি রক্তাক্ত হয়ে পড়ে রইলাম।পরদিন সকালে যখন আমার জ্ঞান ফিরল তখন দেখি আমার সামনে একজন পাকসেনা চেয়ার পেতে বসে আছে।আমার চোখে চোখ পড়তেই সে আমার কাছে এসে আমার সকল কাপড় খুলে নিল।তারপর আমার পেটের দিকে তাকিয়ে বলল ,তুই তো গর্ভবতী।আমি আকুতি মিনতি করতে থাকলাম।তাতে কোন কাজ হলো না।আবার ধর্ষণের শিকার হলাম।হাত পা বাধা অবস্থায় উলঙ্গ শরীর নিয়ে মাটিতে লুটিয়ে রইলাম।এরপর একজন পাক সেনা এসে আমার বুকে মুখ দিয়ে ---ছিঃ ।
কিছু সময় চুপ থেকে রাশিদা বেগম ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল।রিমা বলল ,
-আর বলতে হবে না।কয়েক মিনিট নিরব থেকে রাশিদা বেগম বলল ,
জানিস-দিদি ভাই, সেই তিনদিনের কথা মনে পড়লে আমার আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না।আমার সামনে একটি মেয়েকে বিশ বাইশজন মিলে ধর্ষণ করে মেরে ফেলে।আমি ঐ ঘটনার সময় চিৎকার করে উঠেছিলাম তাই ঐ জানোয়াররা আমার এই অবস্থা করে।তিন দিনের মাথায় তোর দাদাসহ একদল মুক্তিযোদ্ধা ঐ ক্যাম্পে হামলা করে।তখন মাত্র দুইজন প্রহরী ছিল।তাদের গুলি করে আমাকে সহ আরো তিন নারীকে উদ্ধার করে।ক্যাম্প থেকে ফিরে আমি অনেক বার আত্মহত্যা করতে চেয়েছি কিন্তু পারিনি।বার বার মনে হয়েছে আমার গর্ভে তোর দাদার শেষ চিহ্ন ।তাই মরতে পারিনি।এতগুলো বছরে কয়েক হাজার রাত আমি ঘুমতে পারি নি, চোখ বুঝলেই ঐ জানোয়ারদের মুখগুলো চোখে ভাসে।
যুদ্ধের সময় পাক সেনাদের নাকি টিক্কা খান নির্দেশ দিয়েছিল "যত পারো ধর্ষণ করতে হবে।বাঙালি মা বোনদের যত বেশি গর্ভবতী করা যাবে তত আমাদের জয়লাভ সহজ হবে, কারণ জন্মগ্রহণ কারী বাচ্চারা ওদের পিতাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে না।"

দাদির কথাগুলো শুনতে শুনতে রিমা এতক্ষণ হারিয়ে গেয়েছিল একাত্তরে।বেশ কিছুক্ষণ দু'জন কোন কথা বলতে পারল না।দু'জনই অঝরে কাঁদছে।হঠাৎ রাশিদা বেগম বলে উঠলেন -
-কিরে , তুই কাঁদছিস কেন ?
এবার রিমা দাদিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো।দাদি কিছুই বুঝতে পারলো না, রিমা কেন এভাবে কাঁদছে।
রাশিদা বেগম এবার রিমাকে জোর করে বুক থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
-অনেক হয়েছে ,আর কাঁদতে হবে না,তুই আমাকে এতো ভালবাসিস ?
রিমা কোন উত্তর করলো না।রাতের গভীরতা আর দু'জনের নিরাবতায় ঘর জুড়ে শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ।চারটি চোখ বন্ধ থাকলেও ঘুমের দেবতা আজ উধাও ।রিমার চোখে এখন নিজের ভুলগুলো এক এক করে ধরা দিচ্ছে ।এতো অল্প বয়সে বর্তমান আধুনিকতার ছোঁয়ায় নিজেকে উজাড় করে দেয়া।ভালবাসার মানুষের কাছে সর্বস্ব সমর্পণ ।কীসের জন্য এই সমর্পণ ,বিনিময়ে কিবা পেলাম।দাদিকে তো সমর্পণ করতে হয়েছিল।করতে হয়েছিল একটি পৈশাচিক শক্তির কাছে।বিনিময়ে একটি দেশ পেয়েছিল, পেয়েছিল একটি মানচিত্র, পতাকা -অনেক কিছু।আর আমি-----ছিঃ।আর ভাবতে পারছে না রিমা।গলা শুকিয়ে আসছে।নিজের উপর ঘেন্না হচ্ছে।আর বাঁচতে ইচ্ছে করছে না রিমার।ভোরে মসজিদের মিনার হতে আজানের সুর ভেসে আসছে।রাশিদা বেগম পাশ ফিরে দেখলো ফাঁকা বালিশ।দরজাটা হাট করে খোলা।


18/11/2016

No comments:

Post a Comment