অদ্ভুত টান
রুহুল আমীন।
----------------------------------
বাথরুম হতে হাত মুখ ধুয়ে বাইরে বের হয়ে তোয়ালেটা খুজে পাওয়া গেল না।ঘরের এদিক-সেদিকে তাকাতেই খেয়াল হলো, ওটা তো আজ ছাদে শুকাতে দেয়া হয়েছিল-বেখেয়ালে ওঠানো হয়নি। দেয়ালে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চোখে বিস্ময় ফুটে উঠলো।একা ঘরে টিভিতে খবর দেখতে দেখতে কখন যে রাত বারটা পার হয়েছে ইমনের সে খেয়াল নেই।একাকী সময় পার হতেই চাই না।কিন্তু আজ সকাল থেকে কেন যেন সব কিছু এলোমেলো হচ্ছে ।দুই ঠোঁটে বিড়বিড় করতে করতে দরজা খুলে তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করল।চারতলা হতে পাঁচতলার ছাদ পর্যন্ত উঠতে ত্রিশটি ধাপে পা চালাতে চালাতে নিজের ভুলো মনকে গালাগাল করছিল ইমন।
ছাদে পা রাখতেই কানের পাশ দিয়ে একটি চাঁমচিকে সা করে উড়ে গেল।চোখ মুখে ভেজা ভেজা কিছু একটা অনুভূত হলো।সাথে সাথে ইমন মোনাজাতের মত দুই হাত জোড় করে চোখ মুখ ডেকে মুছতে শুরু করলো।এমন সময় কানে এলো মন বিমোহিত করা বাঁশির সুর।চোখ খুলতেই দেখলো ছাদের এক কোনে বসে কে একজন একমনে বাঁশি বাজাচ্ছে ।ছাদের এক কোনে খোলা আকাশের দিকে মুখ করে এমনভাবে বসে আছে ,তার মুখ দেখা যাচ্ছে না।রাত ঘুটঘুটে কালো না হলেও চাঁদের আলো আশপাশের বড় বড় বিল্ডিংয়ে ঢেকে গেছে।ছাদের কিনারায় কার্নিসে মুখ করে বসে থাকায় তাঁকে দেখতে হলে ঘুরে বসতে বলতে হবে।
মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয় বা সুর কেটে যাবে এটা ভেবে কোন প্রশ্ন না করে ইমন পিছনে দাড়িয়ে রইল।পাঁচতলা এই বাড়িতে চব্বিশটি ইউনিট।এতগুলো পরিবারের দুই একটি ছাড়া প্রায় সবই অপরিচিত।এর মধ্যে
কারো কারো প্রতিভা থাকবে না, তা তো হয় না।সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেবাঁশির সুর থেমে গেল।ভরাট গলায় বাঁশিওয়ালা বলল-
-বসুন।
ইমন ভদ্রতার খাতিরে বলল,
-না থাক
বাঁশিওয়ালা ইমনের হাত ধরে বসিয়ে দিল।কিন্তু কি অদ্ভুত!হেমন্তের ঠান্ডা হাওয়ায় তার হাত যেন সাপের শরীরের মত ঠান্ডা মনে হলো।ইমন আরো অবাক হলো যখন দেখলো বাঁশিওয়ালা যে তোয়ালেটা পেতে বসে আছে এবং তাঁকে বসালো ,সেটা তারই ,এটা নিতেই ইমন ছাদে এসেছে।
ইমন কিছুই বলতে পারলো না।বাঁশিওয়ালা আবার বাঁশিতে সুর তুললো।
ইমন বেশ কিছুক্ষণ নীরব শ্রোতার মত সুরের মাঝে হারিয়ে গেল।নিজেকে হারিয়ে ফেললো পুরনো দিনে-স্কুল -কলেজ জীবনের হাসি-আড্ডা ,হৈ-হিল্লোলে।আজ জীবনের আঁকাবাঁকা পথে সুখগুলো হারিয়ে গেছে কেমন গোলকধাঁধায়।বন্ধু পরিজন সকলেই যে যার পথে।ভাবতে ভাবতে হালকা বাতাসে শরীরটা ক্রমেই হিম হতে থাকল।ইমন আর বসতে পারছে না।শরীরের মধ্যে কি এক অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে ।তারপরও অদ্ভুত টান অনুভূত হতে লাগলো।উঠি উঠি করেও ওঠা হচ্ছে না।কিন্তু রাত গভীরতা বাড়ছেই।এবার ইমন প্রায় জোর করেই বলে উঠল-
- এবার তাহলে উঠি ভাই ? আমার তোয়ালেটা।
বাঁশিওয়ালা এবার ইমনের দিকে ঘুরে বসলো।কিম্ভুত চেহারা, হাতে একটি লম্বা হাড়ের বাঁশি, কাধের উপর লম্বা দুটি ডানা ,
কোলের উপর একটি মাংসের প্লেট-যাতে তাজা রক্ত।
ইমন একটি দম ফাটানো চিৎকার দিয়ে ছুটে পালাতে চাইল।কিন্তু উঠে দাঁড়াতে পারলো না।শরীর যেন বরফে জমাট বেঁধেছে ।কোন ভাবেও সে জমাট খুলছে না।আস্তে আস্তে কে যেন চোখের পাতা বন্ধ করে দিল।
সকালে পাশের রুমের হাসান সাহেব ইমনের ঘরের দরজা খোলা দেখে হাক-ডাক শুরু করলেন।
-ইমন সাহেব, কোথায় গেলেন ? আজ যে খুব ভোরে উঠেছেন ?
ডাকতে ডাকতে ইমনের ঘরে ডুকে গেলেন কিন্তু কোন সাড়া নেই।বাথরুমের দরজাটাও হাট করে খোলা।
হাসান সাহেব মনে মনে ভাবলেন -গত ছয় মাস ধরে এই বাড়িতে পাশাপাশি রুমে আছি ,কখনও দেখিনি ইমন সাহেব এত ভোরে উঠেছেন।কতদিন বলেছি, দেরিতে বিছানায় যাবেন না, সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়বেন আর ভোরে ওঠার অভ্যাস করুন।ভোরে ছাদে আমার সাথে হাঁটবেন, দেখবেন খুব ভাল লাগবে।এতদিনে তাহলে কথাগুলো কাজে লাগলো, কিন্তু দরজা এভাবে খুলে রেখে কেউ যায় ,মানুষটা সারাক্ষণ কি টেনশন করে -তাও বলে না।এই টেনশন রোগটা বড় ভয়ানক ,এ রোগের কোন ওষুধ নাই।আত্মভোলা মানুষ একটা।এসব ভাবতে ভাবতে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে গেলেন হাসান সাহেব।
ছাদে উঠেই দেখলেন এক কোনে তোয়ালে পেতে জড়সড় হয়ে শুয়ে আছে ইমন।
হাসান সাহেব চতচকিত ভাবে বললেন -
-একি ,আপনি এখনে ঘুমাচ্ছেন !
কিন্তু কোন সাড়া এলো না।হাসান সাহেবের বুকের মধ্যে আচমকা ব্যথায় মুচড়ে উঠল।
হাসান সাহেব ইমনের পাশে বসে গায়ে হাত দিয়ে আতকে উঠলেন।
No comments:
Post a Comment