সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় প্রকৃতির একটি শক্তি শালী নিয়ামকের মধ্যে অন্যতম নিয়ামক। শক্তির দিক থেকে এক একটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় কয়েক হাজার বোমার সমান শক্তি নির্গত করতে সক্ষম।
ঘূর্ণিঝড় সাধারণত সমুদ্রের অভ্যন্তরে সৃষ্টি হয়ে সেটি ক্রমশ স্থলভাগের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। অতপর ক্রমশ দূর্বল হেয়ে হয়ে স্থলভাগে অাছড়ে পড়ে।
ঘূর্ণিঝড় সমুহ সমুদ্রের উৎপত্তির স্থল ভেদে সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়গুলির বিভিন্ন নামে অভিহীত করা হয় বা পরিচিত লাভ করে।
যেমনঃ
টাইফুনঃ যদি ঘূর্ণিঝড় উত্তর পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্টি হয় তবে সেটি টাইফুন অভিহীত করা হয়। চীনা শব্দ টাই-ফেং থেকে এসেছে, যার অর্থ প্রচন্ড বাতাস। অনেকে অবশ্য মনে করেন ফার্সি বা অারবি শব্দ তুফান থেকেও টাইফুন শব্দটি আসতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।
সাইক্লোনঃ যদি ঘূর্ণিঝড় ভারত মহাসাগর ও অষ্টেলিয়া অঞ্চলে সৃষ্টি হয় তাহলে সেটি সাইক্লোন অভিহীত করা হয়। সাইক্লোন শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ কাইক্লোস (kyklos) থেকে, যার অর্থ বৃত্ত বা চাকা। এটা অনেক সময় সাপের বৃত্তাকার কুন্ডলী বুঝাতেও ব্যবহূত হয়।
হারিকেনঃ যদি ঘূর্ণিঝড় পূর্ব প্রশান্ত মহা সাগর ও অাটলান্টিক মহাসাগরে সৃষ্টি হয় তাহলে সেটি হারিকেন অভিহীত করা হয়।
মায়া দেবতা হুরাকান যাকে বলা হত ঝড়ের দেবতা, তার নাম থেকেই হারিকেন শব্দটি এসেছে বলে অনেকে মনে করেন।
ঘূর্ণিঝড়ের ফলে বাতাসের গতিবেগ যদি ঘণ্টায় ৬২ থেকে ৮৮ কিলোমিটার হয় তাকে ঘূর্ণিঝড় বা ট্রপিক্যাল সাইক্লোন বলা হয়। গতিবেগ যদি ৮৯-১১৭ কিলোমিটার হয়, তখন তাকে তীব্র ঘূর্ণিঝড় বা ‘সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম’ বলা হয়। আর বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৮ থেকে ২১৯ কিলো মিটার হয়, তখন সেটিকে হ্যারিকেন গতি সম্পন্ন ঘূর্ণিঝড় বা ‘ভেরি সিভিয়ার সাইক্লো নিক স্টর্ম’ বলা হয়। গতিবেগ ২২০ কিলো মিটার বা তার বেশি হলে তাকে ‘সুপার সাইক্লোন’ বলা হয়।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার আঞ্চলিক কমিটি গুলি একেকটি ঝড়ের নামকরণ করে থাকে। এবারের সুপার সাইক্লোন অাম্ফান এর নামকরণ করেছে থাইল্যান্ড। যার অর্থ শক্তিশালী।
প্রকৃতিতে সামুদ্রিক ঘূর্ণি ঝড় একটি অতি স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছর গুলোতে অতি শক্তিশালী সামুদ্রিক ঘূর্ণি ঝড় বেড়েই চলেছে। সেইসাথে সামুদ্রিক ঘূর্ণি ঝড় গুলো অারো শক্তিশালীও হচ্ছে ক্রমান্বয়ে।
কেন সামুদ্রিক ঘূর্ণি ঝড় গুলো এত বেশি শক্তিশালী হচ্ছে, কারণ কি? কি বা রহস্য লুকিয়ে অাছে এই সামুদ্রিক ঘূর্ণি ঝড় সৃষ্টির প্রক্রিয়ার পিছনে?
সূর্যের উত্তাপে সমুদ্রের উপরি ভাগের বাতাস ক্রমশ উত্তপ্ত অার অধিকতর অার্দ্র হয়ে উঠে। অার্দ্র বাতাস সাধারণ বাতাসের তুলনায় হালকা হওয়ায় তা উপরের দিকে উঠতে থাকে। ফলে ঔ অঞ্চলের বাতাসের চাপ অপেক্ষাকৃত কমে যায়। অাশে পাশের শীতল বায়ু তখন চক্রাকার পথে নিম্নচাপের অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়।
সমুদ্রের পানির উপর দিয়ে চক্রাকারে অগ্রসর হওয়ার সময় শীতল বায়ু অধিক অার্দ্র হয়ে পড়ে এবং উপরের দিকে উঠতে থাকে। অার্দ্র বাতাস শীতল হয়ে মেঘ সৃষ্টি করে এবং বৃষ্টিপাত ঘটায়। এই প্রিক্রিয়া লাগাতার চলতে থাকে। একসময় এটি সামুদ্রিক ঘূর্ণি ঝড়ে রুপ নেয়। সামুদ্রিক ঘূর্ণি ঝড় যত বেশি সময় সমুদ্রে অবস্থান করে তত বেশি সেটি শক্তিশালী হয়ে উঠে।
বিজ্ঞানীগণ গবেষণায় বলছেন বায়ুমন্ডলের তাপ মাত্রা যতই বাড়ছে সামুদ্রিক ঘূর্ণি ঝড়ের সংখা ও শক্তি ততই বাড়ছে। উত্তপ্ত সমুদ্র সামুদ্রিক ঘূর্ণি ঝড়ের জন্য পাওয়ার হাইজ হিসাবে কাজ করে। অাবার উষ্ণতা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ছে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে অধিকতর উচ্চতার জলোচ্ছাস।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতার সঙ্গে সঙ্গে সামুদ্রিক ঘূর্ণি ঝড়ের তীব্রতা অারো লাগামহীন হয়ে পড়বে। অার বঙ্গোপ সাগরের অঞ্চলের অাশে পাশে অঞ্চল হবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল গুলোর একটি।
তাই যে কোন মূল্যে বৈশ্বিক উষ্ণতার লাগাম টেনে ধরতে হবে। যা করতে হবে তা এখুনি এ প্রজন্মকেই। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যেন নরক নয়, একটি সুন্দর পৃথিবী উপহার দিতে পারি এটাই হোক অাজ অামাদের সকলের প্রত্যয় ও অঙ্গীকার।
লেখক: রফিকুল ইসলাম সরকার
(ছড়াকার, কবি, কলামিষ্ট, উন্নয়ন কর্মী)

No comments:
Post a Comment